প্রসঙ্গঃ অগস্তি, গুটখা, চাড্ডি আর ভাষাচেতনা সমিতি

0
1029

সুবর্ণ ন্যায়ধীশ:- অবাঙালীদের দৌরাত্মে বাংলার বেশ কিছু শহরে বাঙালীরা বেজায় বেকায়দায় পড়েছেন তা প্রায় দেড় দশক ধরে। খাস কলকাতার বড় বাজারে তো ত্রিশ বছর আগেই লজ্জায় মুখ ঢেকেছে ‘আমরি বাঙলা ভাষা’ আসানসোল, দুর্গাপুর, খড়্গপুর, রানিগঞ্জ তো বটেই, এখন পুরুলিয়াতেও ঝাড়খন্ডী হিন্দির যা দাপট! দিন কে দিন, নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাচ্ছে বাংলা। আর চোখ কপালে তুলে হা হতাশ করছে আপামর ‘বীর বাঙালী’। বাঙালীর মুখের ওপর বাসে, ট্রেনে, বাজার-হাটে দেহাতীরা হিন্দিতে ফটর ফটর করছে, বাঙালী কপাল চাপড়াচ্ছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহি কবি কাজী নজরুল ইসলাম বা মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত- এঁরা স্বর্গে থেকে দুবেলা বিলাপ করছেন-আর এদিকে যা হবার তাই হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর, দুর্গাপুরে মেয়র দিলীপ অগস্তির উষ্মা প্রকাশ সমাজে বেশ আলোড়ন তুলেছে। কেউ তো অন্ততঃ বলল, “বাংলায় থেকে বাংলায় কথা বলবনা?” অগস্তি এক লহমায় শহর দুর্গাপুরের আপামর বাঙালীর মন জিতে নিয়েছেন। সম্প্রতি দুর্গাপুরে রাজ্য সরকারের বাংলা মাধ্যম কলেজের একটি অনুষ্ঠানে সঞ্চালিকার জবরদস্তি অনর্গল হিন্দিতে অনুষ্ঠান পরিচালনার ঔদ্ধত্য বেজায় চটেছিলেন দুর্গাপুরের মেয়র দিলীপ অগস্তি । তার বিরক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মাঝপথে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যান। তারপরে শহরজুড়ে শুরু হয় চাপানউতোর। সেই ২০১৭ সালে মেয়র হবার পর থেকে দুর্গাপুরের অনেকেই, এমনকি তার দলের কাউন্সিলারদের একাংশও তাকে দুচক্ষে দেখতে পারত না। মুখে মুখে তর্ক- বিতর্কও করেছেন অনেকে। তিনি ও কার্যতঃ মেয়র হিসেবে শহরে আলাদা করে সন্মান পাবার মতো কিছুই করেননি গত আড়াই বছর। তবে, এই প্রথম শহরবাসী মালুম পেল-‘আছে। শহরে একটা অভিভাবক অন্ততঃ আছে। যে যা খুশি বলে পার পেয়ে যাবে, এমন টা আর নয়। মুখের ওপর দাবড়ে দেওয়ার মত মরদ ফুরিয়ে যায়নি বাঙালীর।” বাঙলা বলায় ঝোঁক ছিল দুর্গাপুরের বাম আমলের টানা তিনবারের মেয়র রথীন রায়েরও। তবে, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ব বিদ্যালয়ের সমাবর্তনে, দেশ-বিদেশের তাবড় পন্ডিতদের সামনে তার বাঙলায় ভাষণ দেওয়ার আব্দার কিন্তু আসলে ছিল ইংরাজি না বলতে পারার কারনে। সকলেই এটা বুঝতো, অগস্তির মতো জেদ করে “বাঙালাতেই বলিব” এই কারনটা ছিল না। সেটা রথীন নিজেও জানেন। অবশ্য”মেয়র হইতে গেলে ইংরাজী বলিতেই হইবে”- এমন কোনো নিদান স্বাধীন বাংলায় নাই। তাই রথীনের অপারগতাকে সেই অর্থে কটাক্ষ করারও কিছু নাই। এখন বিষয় হল- অগস্তির ‘দাপট’ না হয় বাঙালী বুদ্ধিজীবিদের সংখ্যাগরিষ্ঠকে খুশি করল। বুকে বল আনল তাদের। কিন্তু, বেশ ডিপ্লোওম্যাটের মতো তিনি যে বলটা সমাজের বৃহত্তর অংশের কোর্টে ঠেলে দিলেন, তার অভিঘাত, তার মর্যাদা – শেষ পর্যন্ত বিষয়টিকে কতদুর গড়িয়ে নিয়ে যায়- সেটাই দেখার! এতে বাঙালী যুবকেরা কি ‘বাঙলায় বলো’ বিপ্লবে নামতে কোমর বাঁধছে? নাকি যে যার পছন্দমাফিক চ্যানেলে মুখ দেখানো হয়ে গেল। গল্প শেষ!! প্রশ্ন আরো একটি রয়েছে – অগস্তি তো সপাটে একটি ধাক্কা দিলেন বটে, কিন্তু এই ধাক্কার লক্ষ্য কি সুদুর প্রসারী ছিল, নাকি রগচটা মানুষের ‘জাস্ট’ একটা তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া। আসানসোল, দুর্গাপুরময় দুবেলা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যে ‘গুটখা’ কালচার, মাছভাতের বাঙালীকে তাচ্ছিল্য করে পেল্লাই বাহুবলী যে সব ‘চাড্ডি’ বাংলা রাজ্যটাকে এখনো ‘বংগাল’ বলে নস্যি ঝাড়ে তাদের ভাতের হাঁড়ি নাড়িয়ে কি বোঝানো গেল- “যে মাটিতে চাষ করে কাড়িঁ কাড়িঁ কামাচ্ছো বাছাধন, সে মাটির ভাষাকে অবজ্ঞা, অসন্মান করলে কপালে ভোগান্তি আছে?” সম্ভবতঃ তা বোঝানোর এখনো অ-নে-ক বাকি। শহরের ভাষা- চেতনা সমিতিতে বেশ কিছু লেখাপড়া জানা মানুষ আছেন। ওঁদের কাছে কিন্তু বিষয়টা অতটা হাল্কা নয়। তবে শংকায় রয়েছেন ওনারাও। শেষে বিষয়টা সবুজ, গেরুয়া, লালে ভাগ হয়ে আসল ‘জোশ’ টা ফিকে হয়ে যাবে না তো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here