বিশ্বের আশ্চর্যজনক কিছু গর্ত এবং তাদের রোমহর্ষক রহস্য

0
2317

নিউজ ডেস্ক, এই বাংলায়ঃ আমাদের এই বিশাল বিশ্বে রহস্যের শেষ নেই। প্রকৃতি যেন পৃথিবীর কোনায় কোনায় নানান সব রহস্যের জাল বুন রেখেছে। আর এই প্রাকৃতিক রহস্যের খোঁজে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সবসময় নানান গবেষণা, খননকার্য, দুঃসাহসিক অভিযান লেগেই রয়েছে। পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়, যারা শুধুমাত্র পৃথিবীর এই রহস্য খুঁজে পেতে এবং অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বিশ্বের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে চলেছেন। বর্তমান এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রহস্যময় গর্ত নিয়ে আমাদের আজকের এই প্রতিবেদন। রহস্যময় এই পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু গর্ত রয়েছে যা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই, এরই মধ্যে বেশ কিছু গর্ত যা যেকোনো রোমহর্ষক কাহিনীকেও হার মানাবে। আসুন বিশ্বের সেই পাঁচ রহস্যময় গর্তের বিষয়ে জানা যাক।

১। জাহান্নামের দরজা (Door to Hell) : নামটা শুনেই কেমন যেন অদ্ভূত লাগলো তাই তো? কিন্তু রহস্যময় এই গর্তের নামকরণের পেছনেও রয়েছে সম্মত কারণ। বর্তমানে তুর্কিমেনিস্থানের রাজধানী আসগাবাট থেকে ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত দারওয়াজা অঞ্চলে রয়েছে “জাহান্নামের দরজা” নামক এই রহস্যময় গর্ত। জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগে ১৯৭১ সালে প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই দারওয়াজা অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের খোঁজে ঘাঁটি তৈরী করেন সোভিয়েত রাশিয়ার একদল ভূবিজ্ঞানী। বেশ কিছুদিন গবেষণার পর তারা ওই অঞ্চলে খননকার্য শুরু করলে যেখানে তারা খননকার্য চালাচ্ছিলেন সেখানে ব্যাপক ভূমিধস নামে এবং সঙ্গে সঙ্গে ৭০ মিটার গভীর এক বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, ওই গর্ত থেকে ক্রমে মিথেন গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। এই বিষাক্ত মিথেন গ্যাস নির্গমনের ফলে যেমন পরিবেশের মারাত্মক দূষণ হচ্ছিল তেমনি দারওয়াজা অঞ্চলের বসবাসকারী মানুষের পক্ষেও তা ক্রমে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ভূবিজ্ঞানীরা প্রাথমিকভাবে মনে করে করেছিলেন গ্যাসের পরিমাণ খুব বেশি হবে না, তাই দ্রুত ওই গর্তের মিথেন গ্যাস নিঃশেষ করতে তাঁরা ওই গর্তে আগুন ধরিয়ে দেন। কিন্তু সেই শুরু, তারপর থেকে নাগাড়ে প্রায় পাঁচ দশক ধরে জ্বলছে ওই বিশাল গর্তের আগুন। বর্তমানে এই রহস্যজনক গর্ত আকর্ষন বাড়িয়েছে পর্যটকদের। প্রত্যেক বছর বিপজ্জনক এই Door to Hell দেখতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখানে ভিড় জমান। ২০১০ সালে তুর্কিমেনিস্থানের প্রেসিডেন্ট ওই মিথেন গ্যাসে পরিপূর্ণ গর্তের আগুন নিভিয়ে সেখানে প্ল্যান্ট নির্মানের ইচ্ছাপ্রকাশ করলেও আজও তা শুরু হয়নি।

২। গুয়াতেমালা সিটি সিঙ্কহোল (Guatemala City Sinkhole): ২০০৭ সালে গুয়াতেমালা শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি সড়কের ওপর প্রায় ৩০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে আচমকায় ভয়াবহ ধস নামে, যার গভীরতা ছিল প্রায় ১০০ মিটার। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় বহু বাড়ি ঘর ধসে যায়, ৪ জন প্রাণও হারান। নিরাপত্তার কারণে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেওয়া হয়। তদন্তে জানা যায়, মাটির নিচে দিয়ে যাওয়া পয়ঃপ্রণালীর পাইপ ফেটে রাসায়নিক মিশ্রিত জল চুনাপাথর, ভলক্যানিক অ্যাশ এবং অন্যান্য পদার্থ মিশ্রিত পাথরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তা দুর্বল করে দেওয়ায় এই ভয়াবহ ধস। এরপর গুয়াতেমালা সরকার প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যায়ে মাটি ও কংক্রিট দিয়ে ওই বিশাল গর্ত বন্ধ করে। কিন্তু এর ঠিক তিন বছরের মাথায় ফের ২০১০ সালে একইভাবে ভয়াবহ ধস নামে গুয়াতেমালা শহরে। এই ধসে গোটা একটি কারখানা ভূর্গভে বিলীন হয়ে যায়, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৫ জন। এবারও তদন্তে উঠে আসে একই তথ্য। বিজ্ঞানীরা জানিয়ে দেন পয়ঃনিস্কাশন প্রণালীর পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতেও এইধরনের ঘটনা ঘটতে পারে এই শহরে।

৩। সেরস্যারিনামা সিঙ্কহোল (sarisarinama Sinkhole): ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে রহস্যময় গর্ত হল সেরস্যারিনামা সিঙ্কহোল। বলা হয়, এইরকম রহস্যময় গর্ত পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। গভীর ও বিস্তীর্ন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এই রহস্যময় গর্তে বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে। শোনা যায়, এই জঙ্গলে এখনও এমন বন্য মানুষ আছে যারা জীবিত মানুষের মাংস খায়। কিন্তু তা এখনও প্রমাণিত নয়। অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এই জঙ্গলে মানুষের প্রবেশ নেই বললেই চলে। আকাশপথে এই গর্তের ২ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়া যায়।

৪। বিমমাহ সিঙ্কহোল (Bimmah Sinkhole): ওমানে অবস্থিত এই সিঙ্কহোল বিশ্বের সুন্দর সিঙ্কহোল গুলির মধ্যে অন্যতম। সমুদ্র থেকে মাত্র ৭০০ মিটার দূরে অবস্থিত এই রহস্যময় গর্ত মাত্র একদিনে তৈরী হয়েছিল বলে জানা যায়, যার গভীরতা ২০ মিটার আর বিস্তার প্রায় ৭০ মিটার। এই রহস্যময় গর্তের জল নীলাভ এবং কাঁচের মতো স্বচ্ছ, তাই একে প্রাকৃতিক সুইমিংপুল-ও বলা হয়। রহস্যময় এবং সুন্দর এই সিঙ্কহোল দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় করেন এই সিঙ্কহোল দেখতে। আর এখানে এসে প্রাকৃতিক এই সুইমিংপুলে স্নান না করে চলে যান এমন পর্যটক প্রায় নেই বললেই চলে।

৫। গ্রেট ব্লু হোল (Great Blue Hole): পৃথিবীর সবথেকে রহস্যময় ও সবথেকে বড় গর্ত হল গ্রেট ব্লু হোল। বেলিচ শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে লাইটহাউস প্রবাল প্রাচীরের কাছে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত এই গর্ত যেমন সুন্দর তেমনি রহস্যে পরিপূর্ণ। এর গভীরতা ১২০ মিটার এবং চওড়া প্রায় ৩০০ মিটার। সমুদ্রের তলদেশে হওয়ায় এই গ্রেট ব্লু হোলে প্রচুর সামুদ্রিক প্রাণী বসবাস করে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কয়েক লক্ষ বছর আগে এটি একটি চুনাপাথরের গুহা ছিল। কিন্তু ক্রমে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রের জল বৃদ্ধি পেয়ে এই চুনাপাথরের গুহাটি প্লাবিত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চুনাপাথরের গুহা ধসে গিয়ে এই অদ্ভূত সুন্দর ব্লু হোলের নির্মান করেছে। সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে গবেষণা করতে বহু ডুবুরি এই ব্লু-হোলে প্রবেশ করেন। এই ব্লু হোলের গুরুত্ব বিচার করে UNESCO এই গ্রেট ব্লু হোলটিকে “WORLD HERITAGE SITE” হিসেবে ঘোষণা করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here